সিনেমাই তো তোমার কপালে লেখা ছিল
তপন সিংহর সঙ্গে আলাপ ‘আজকাল’ পত্রিকার জন্য ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে। তখন আমি থিয়েটার করি। নাচও শিখি। আবার মনে মনে সিনেমায় অভিনয় করার ইচ্ছেও ষোল আনা! কিন্তু সাহস নেই ঝাঁপিয়ে পড়ার, আর বাড়িতেও তেমন মদত নেই।
তাই সাংবাদিক হিসেবে সিনেমার লোকজনের ইন্টারভিউ নিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। তপনবাবুর বাড়িতে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়, যিনি তখন আজকালে ফিচার পেজ দেখেন। আমহার্স্ট স্ট্রিট থেকে যখন আলিপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেছি, তখনই আকাশে মেঘ আর টুপটাপ বৃষ্টির শুরু। যতক্ষণে রাসবিহারী হয়ে চেতলা আর দুর্গাপুর ব্রিজ পৌঁছেছি, আকাশে শুম্ভ-নিশুম্ভর যুদ্ধ! ঝমঝমিয়ে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি। কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না। রঞ্জনদা এমনিতেই রাস্তা বা ঠিকানা মনে রাখা সম্পর্কে দুর্বল, তার উপর এই ভীষণ প্রাকৃতিক দুর্যোগে আলিপুরে এসে একেবারে দিশাহীন হয়ে পড়লেন। বৃষ্টির মধ্যে উপায় না দেখে খানিক ঘোরাঘুরির পর একটা ধারে থিতু হলাম! গাড়ির মধ্যেই বসে আছি। বৃষ্টি থামতে রঞ্জনদা বেরিয়ে একটি দোকানে গিয়ে ঠিকানা জিজ্ঞেস করলেন। তখন তো আর জিপিএস বা মোবাইল ফোন নেই। দোকান থেকে হাসিমুখে ফিরে বললেন, ‘একেই বলে ভবিতব্য, যে বাড়ির সামনে আশ্রয় নিয়েছি, সেটাই তপনবাবুর বাড়ি।’
তড়িঘড়ি নামলাম গাড়ি থেকে। ছপাত করে পা পড়ল জলে।
নর্দমার জল পায়ে লেগে গেছে, জিনস-এর তলাটা কর্দমাক্ত। নিজেরই লজ্জা করছিল। বাড়িতে ঢুকে জুতোটা খুলে কোথায় লুকোব ভাবছি। সিঁড়ির উপর থেকে বললেন, ‘নীচে বাথরুম আছে, পা ধুয়ে নাও।’
পা ধুয়ে বেরিয়ে যতক্ষণে উপরে গেলাম, বসার ঘরে রঞ্জনদা জমিয়ে বসেছেন। আমার সম্পর্কে বোধহয় অনেক কিছু বলেছিলেন, আমার অভিনয়ের ইচ্ছের কথাটাও নিশ্চয়ই বলেছিলেন। আমি ঢুকতেই তপনবাবু বলে উঠলেন, ‘বাংলা বা ইন্ডিয়ান সিনেমাতে অভিনয় করতে হলে জিনস ছাড়াও দেখতে হবে শাড়িতে আপনাকে কেমন লাগে, আর চুল এত ছোট হলে সমস্যা। আমাদের এখানে ভাল উইগ তেমন পাওয়া যায় না। তবে রঞ্জন যখন বলেছে, আমি একবার টেস্ট করে দেখব, আপনি অভিনয় পারবেন কি না। নতুনদের নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি।’
আমার তো লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়ার জোগাড়।
‘শুনলাম তুমি নাটক করো। ওটা খুব ভাল মিডিয়াম শেখার, তবে ফিল্মে অভিনয় অন্য জিনিস।’
কোথায় আমি ওঁকে ইন্টারভিউ করব, তা নয়, উনিই আমার সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলে চললেন। আমি লোরেটো কলেজে ইংরেজি নিয়ে পড়েছি অথচ বাংলা কাগজে কাজ করছি শুনে অবাক হলেন। বললাম, গোখলেতে পড়েছি। ‘ও, তাই বাংলা উচ্চারণে একটু বেশি স্পষ্টতা! অভিনয় করার সময় ওরকম এত কেটে কেটে কথা বলা চলবে না।’
সেদিন প্রায় তিন-চার ঘণ্টা চলল আড্ডা। ওঁর ছবি তৈরির অভিজ্ঞতা, বিলেতে কাজের অভিজ্ঞতা, সিনেমার বিষয় নির্বাচন নিয়ে ভাবনাচিন্তা। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ বা ‘ঝিন্দের বন্দী’ যেমন আমাকে অ্যাট্রাক্ট করেছে, তেমনই সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে ‘আপনজন’ বা ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ও আমাকে টানে।’
ওঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে বারবার মনে হতে থাকে, কত ধরনের বিষয় নিয়ে উনি কতরকমের ফিল্ম করেছেন! আজ মনে হয় আমার জীবনে ওঁর প্রভাব সেদিন থেকেই সবচেয়ে বেশি পড়েছিল। ওঁর মধ্যে কোনও ‘false vanity’ ছিল না। যে মানুষটি ‘গল্প হলেও সত্যি’র মতো জনপ্রিয় ছবি ভাবতে পারেন, তিনিই আবার নাটক থেকে নিয়ে ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ ছবি করে তাক লাগিয়ে দেন। আমি যখন দেখা করি ওঁর সঙ্গে, সেই সময় উনি ‘বৈদূর্য রহস্য’ ছবিটি নিয়ে ভাবছেন। চিত্রনাট্য লেখার কাজ চলছিল। বললেন, এটা একটি রহস্য কাহিনি, সঙ্গে রয়েছে অল্প কমিক ভাবও।
ওঁর পড়াশোনা ছিল অগাধ, সিনেমার বিষয় ও প্রযুক্তি দুটিই নখদর্পণে। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি তিনটি ভাষায় সমান দক্ষ। অনায়াসে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় চলে যাচ্ছেন। আর বাচনভঙ্গি কী স্বাভাবিক! কোথাও কোনও এক্সট্রা ঝোঁক নেই। সাহেবের মতো ইংরেজি, ইউপি-বাসীর মতো হিন্দি, আর কলকাতার বাংলা তো ঠোঁটস্থ বটেই।
সেদিন চলে আসার পর আর কথা হয়নি। লেখাটা পাঠিয়েছিলাম। রঞ্জনদাকে বলেছিলেন, পড়েছেন। ব্যাস।
এর মাস চারেক বাদে ফোন পেলাম, একবার দেখা করতে বললেন। তখন আমি ‘আজকাল’ ছেড়ে ‘টেলিগ্রাফ’-এ। তাপনবাবু কিন্তু রঞ্জনদা মারফত ঠিক আমাকে খুঁজে নেন। আমাদের কাগজের অফিসে তখন স্ট্রাইক চলছে। গেলাম তপনবাবুর কাছে।
‘একটা ছোট চরিত্র আছে, করবে?’
রাজি হয়ে গেলাম। তপনবাবু নিজে বলছেন । অভিনয় করলাম মনোজ মিত্রর সঙ্গে। ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট। ছবি ‘বৈদূর্য রহস্য’। আজও বন্ধুরা ছোট্ট ওই একরত্তি রোলটির কথা বলে!
শুটিং করে আসার পর মাসদুয়েক হয়ে গেল। আমাদের স্ট্রাইক মিটে গেছে, সবে কাজে ফেরত এসেছি। আমি তখন নতুন কিছু দায়িত্ব পেয়েছি। এই সময়ে মা ফোন করে বললেন, তপন সিংহের অফিস থেকে আমাকে খুঁজছে । আমি অফিস থেকে যোগাযোগ করলাম।
ওঁর সহকারী ধরিয়ে দিলেন তপনবাবুকে। ‘শোনো, তুমি যে স্ক্রিন টেস্ট দিলে সেটা ভাল হয়েছে, তাই তোমাকে আমার একটা ছবি, ‘আদমি ওর আউরত’-এর জন্য কাস্ট করেছি। কাল চলে এসো, শুট শুরু হবে দিন সাতেক পরে।’
আমি হতবাক। স্ক্রিন টেস্ট? মানে ওই রোলটি ছিল আমার পরীক্ষা?
কিছুক্ষণ পর আবার ওঁর সহকারীকে ফোন করলাম সবিস্তারে জানতে। শুনলাম, এটি একটি হিন্দি ছবি। আমাকে মুখ্য চরিত্রে কাস্ট করেছেন। একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলা । আমার বিপরীতে আমল পালেকর। দিন দশেকের শুটিং হবে আউটডোরে।
আমি কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ছুটি তো পাব না অফিস থেকে…. তাহলে শুট করব কী করে? চাকরি ছেড়ে দেব?
সারারাত ভাবলাম, মা’র সঙ্গে কথা বললাম, অনেক বিচার-বিবেচনা করে তারপর ‘না’ বললাম। বুক ফেটে যাচ্ছিল। তাও সাহস করে চাকরি ছাড়তে পারলাম না!
লজ্জায়-দুঃখে তপনবাবুর সঙ্গে দেখাও করলাম না। এমনকী পরে যখন ছবিটার শো হয়, তাতেও যাইনি। এরপর বহু বছর কেটে গেছে। টেলিভিশনে কাজ করেছি, নাটক করেছি, সাংবাদিকতা ছেড়ে অডিও-ভিশুয়ালে ঢুকেছি। ঋতুপর্ণর সঙ্গে ছবিতে কাজ করছি।
বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ। এর মধ্যে তপনবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছে কয়েকবার। খুব স্বাভাবিক ব্যবহার করেছিলেন এবং কখনও আর পুরোনো ঘটনা নিয়ে কিছু বলেননি। ঋতুপর্ণর সঙ্গে তপনবাবুর সেটে গেছি একদিন। কারণ ঋতু খুব সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। আমরা পৌঁছে দেখি, তপনবাবুর শুট শুরু হবে হবে, কিন্তু সেটটা তেমন সাজানো হয়নি। উনি ঠিক কী চাইছেন, ওঁর আর্ট ডিরেক্টর বুঝতে পারছেন না। আমি আর ঋতুপর্ণ দুজনেই ঘর সাজাতে পছন্দ করি। মুহূর্তে বুঝে গেলাম, উনি কী চাইছেন। পার্টি সিকোয়েন্স। চটপট লেগে গেলাম প্লেট গেলাস টেবিল-ঢাকা নিয়ে। আধঘণ্টায় রেডি। তপনবাবু দেখে কী খুশি! এতদিন পর বললেন, ‘তুমি যে কেন সেদিন আমাকে না বলেছিলে কে জানে? সিনেমাই তো তোমার কপালে লেখা ছিল।’